সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ বাঙালিকে নিয়ে লিখার আগে বরাবরের মতোই হাত কাঁপে, বুক কাঁপে, শ্বাস ঘন হয়। আগের ইতিহাসের প্রত্যক্ষদর্শী নই। জ্ঞান হওয়া অবধি প্রাইমারি স্কুলে পড়াশুনার সময় যে নামটি আপামর আম জনতার মুখে মুখে শুনেছি তাঁর নাম হলো শেখ মুজিব। নামটা শুনলেই বুকের মাঝে তোলপাড় করতো যা আজব্দি সমান ভাবে বহমান। এটুকু বুঝতে পারতাম যে তিনি হলেন বাংলার দেবশিশু যিনি বাঙালি জাতিকে শোষণের হাত থেকে উদ্ধার করে এক মুক্তির সনদ এনে দেবেন আর তখন আমরা মুক্ত হবো। এদেশে আর রায়োট হবেনা। মায়ের মুখে শুনেছি মুলাদীর রায়োটে আমার মামার বংশের সবাইকে জবাই করে হত্যা করা হয়েছে। তিনি যে মুক্তির সনদের রূপরেখা দিয়েছিলেন সেখানে সংখ্যালঘু সংখ্যাগুরু কোনো বিভাজন ছিলোনা। সবাইকে তিনি বাঙালি নামের পতাকাতলে একত্রিত করেছিলেন। ধর্মটা সেখানে মুখ্য ছিলোনা। মুখ্য ছিলো মায়ের ভাষা আর সেই ভাষাকে কেন্দ্র করে উদ্ভূত জাতীয়তাবাদ। যার নাম বাঙালি জাতীয়তাবাদ। আর একারণেই বিশেষ করে ধর্মীয় সংখ্যালঘুরা তাঁর দল আওয়ামীলীগকে সংকটে সংগ্রামে শেষ আশ্রয়স্থল বলে মনে করে। আমি এই নিবন্ধে তাঁর ভাষণের টুকরো টুকরো অংশ উল্লেখ করবো যা কিনা তাঁর লালিত স্বপ্ন, দিক নির্দেশনা ও আদর্শ প্রতিফলিত হয়েছে।
নভেম্বর ১৯৭০
আজ থেকে ২৪ বছর পূর্বে স্বাধীন দেশের স্বাধীন আশায় জনগণ ভোট দিয়েছিলো পাকিস্তানের পক্ষে। দিন না যেতেই দেখেছেন জনগণের দেয়া সুস্পষ্ট ম্যান্ডেটের বিরুদ্ধে চরম বিস্বাসঘাতকতা আমাদের স্বপ্ন ভেঙে খান খান করে দিয়েছে। কেবল বাংলার সাড়ে সাত কোটি মানুষই নয়, সারা দেশের বারো কোটি মানুষই আজ ভাগ্যের নির্মম পরিহাসে নিজদেশে পরবাসী। আমাদের সন্তান সালাম-বরকত বুকের রক্ত ঢেলে রাজপথে যে সংগ্রামী চেতনায় আমাদের উদ্ভুদ্ধ করে গিয়েছিলো তারই ফলশ্রুতিতে এদেশের জনগণ আজ তাদের অধিকার ফিরে পেতে চলেছে। ১৯৫৪ সালের ঐতিহাসিক নির্বাচনে কায়েমী স্বার্থ, আমলাতন্ত্র ও পশ্চিমাঞ্চলের সামন্তবাদী নেতৃত্বের চক্র ও চক্রান্তের প্রতিভূ যে মসলিম লীগকে বাংলার বুক থেকে সমূলে উচ্ছেদ করা হয়েছিলো, কয়েকমাস যেতেই বাংলার কোন সে ছদ্মবেশী ‘সুসন্তানেরা’ সেই মুসলিম লীগ চক্রের সাথেই হাত মিলিয়ে বাংলার সাত কোটি মানুষের স্বার্থবিরোধী শাসনতন্ত্র রচনায় মত্ত হয়েছিলো তাও কারো অজানা নয়। ব্যক্তিগত স্বার্থের রাজনীতি আওয়ামীলীগ করেনা। তাই জনগণের জন্য আমরা যা চাই তা সুস্পষ্ট ভাষায়, সরাসরি ঘোষণা করি। এ কারণে আমাদের বহু নির্যাতন পোহাতে হয়েছে, কখনো রাষ্ট্রদ্রোহী, কখনো বিচ্ছিন্নতাবাদী, আবার কখনো বিদেশী চর আখ্যাও আমাদের পেতে হয়েছে। ৬ দফা বাংলার শ্রমিক-কৃষক-মজুর-মধ্যবিত্ত তথা আপামর মানুষের মুক্তির সনদ। ৬ দফা শোষকের হাত থেকে শোষিতের অর্থনৈতিক, সামাজিক ও রাজনৈতিক অধিকার ছিনিয়ে আনার হাতিয়ার। ৬ দফা মুসলিম-হিন্দু-খ্রিস্টান-বৌদ্ধদের নিয়ে গঠিত বাঙালি জাতির স্বকীয় মহিমায় আত্মপ্রকাশ আর নির্ভরশীলতা অর্জনের চাবিকাঠি। ৬ দফা বাঙালির আত্মমর্যাদায় সম্মানজনক আত্মপ্রতিষ্ঠার দাবী। ৬ দফার সংগ্রাম আমাদের জীবন মরণের সংগ্রাম। ৬ দফার জয়ের অর্থ এদেশের লাঞ্ছিত ও বঞ্চিত সাধারণ মানুষের মুক্তিসংগ্রামের জয়।
আওয়ামীলীগকে পশ্চিমারা ধর্মবিরোধী প্রচারণা চালালে বঙ্গবন্ধু তার দাঁতভাঙ্গা জবাব দেন। তিনি বলেন- আমাদের বিরুদ্ধে অপপ্রচার করা হচ্ছে আমরা ইসলামে বিশ্বাসী নই। একথার জবাবে আমাদের সুস্পষ্ট বক্তব্য -লেবেলসর্বস্ব ইসলামে আমরা বিশ্বাসী নই। আমরা বিস্বাসী ইনসাফের ইসলামে। আমাদের ইসলাম হযরতে রাসূলে করিম (দ:) এর ইসলাম, যে ইসলাম জগৎবাসীকে শিক্ষা দিয়েছে ন্যায় ও সুবিচারের অমোঘ মন্ত্র। ইসলামের প্রবক্তা সেজে পাকিস্তানের মাটিতে বরাবর যারা অন্যায়, অত্যাচার, শোষণ, বঞ্চনার পৃষ্ঠপোষকতা করে আসছেন, আমাদের সংগ্রাম সেই মোনাফেকদের বিরুদ্ধে। আসুন আমরা দেখি কি ছিলো সেই ৬ দফা দাবিতে :
প্রস্তাব – ১ : শাসনতান্ত্রিক কাঠামো ও রাষ্ট্রের প্রকৃতি: দেশের শাসনতান্ত্রিক কাঠামো এমনি হতে হবে যেখানে পাকিস্তান হবে একটি ফেডারেশনভিত্তিক রাষ্ট্রসংঘ এবং তার ভিত্তি হবে লাহোর প্রস্তাব। সরকার হবে পার্লামেন্টারী ধরনের। আইন পরিষদের (Legislatures) ক্ষমতা হবে সার্বভৌম। এবং এই পরিষদও নির্বাচিত হবে সার্বজনীন ভোটাধিকারের ভিত্তিতে জনসাধারনের সরাসরি ভোটে।
প্রস্তাব – ২ : কেন্দ্রীয় সরকারের ক্ষমতা: কেন্দ্রীয় (ফেডারেল) সরকারের ক্ষমতা কেবল মাত্র দু’টি ক্ষেত্রেই সীমাবদ্ধ থাকবে- যথা, দেশরক্ষা ও বৈদেশিক নীতি। অবশিষ্ট সকল বিষয়ে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির ক্ষমতা থাকবে নিরঙ্কুশ।
প্রস্তাব – ৩ : মুদ্রা বা অর্থ-সমন্ধীয় ক্ষমতা: মুদ্রার ব্যাপারে নিম্নলিখিত দু’টির যে কোন একটি প্রস্তাব গ্রহণ করা চলতে পারেঃ-
(ক) সমগ্র দেশের জন্যে দু’টি পৃথক, অথচ অবাধে বিনিময়যোগ্য মুদ্রা চালু থাকবে। অথবা
(খ)বর্তমান নিয়মে সমগ্র দেশের জন্যে কেবল মাত্র একটি মুদ্রাই চালু থাকতে পারে।
তবে সেক্ষেত্রে শাসনতন্ত্রে এমন ফলপ্রসূ ব্যবস্থা রাখতে হবে যাতে করে পূর্ব-পাকিস্তান থেকে পশ্চিম পাকিস্তানে মূলধন পাচারের পথ বন্ধ হয়। এক্ষেত্রে পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক ব্যাংকিং রিজার্ভেরও পত্তন করতে হবে এবং পূর্ব পাকিস্তানের জন্য পৃথক আর্থিক বা অর্থবিষয়ক নীতি প্রবর্তন করতে হবে।
প্রস্তাব – ৪ : রাজস্ব, কর, বা শুল্ক সম্বন্ধীয় ক্ষমতা: ফেডারেশনের অঙ্গরাজ্যগুলির কর বা শুল্ক ধার্যের ব্যাপারে সার্বভৌম ক্ষমতা থাকবে। কেন্দ্রীয় সরকারের কোনরূপ কর ধার্যের ক্ষমতা থাকবে না। তবে প্রয়োজনীয় ব্যয় নির্বাহের জন্য অঙ্গ-রাষ্ট্রীয় রাজস্বের একটি অংশ কেন্দ্রীয় সরকারের প্রাপ্য হবে। অঙ্গরাষ্ট্রগুলির সবরকমের করের শতকরা একই হারে আদায়কৃত অংশ নিয়ে কেন্দ্রীয় সরকারের তহবিল গঠিত হবে।
প্রস্তাব – ৫ : বৈদেশিক বাণিজ্য বিষয়ক ক্ষমতা: (ক) ফেডারেশনভুক্ত প্রতিটি রাজ্যের বহির্বাণিজ্যের পৃথক পৃথক হিসাব রক্ষা করতে হবে। (খ) বহির্বাণিজ্যের মাধ্যমে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রা অঙ্গরাজ্যগুলির এখতিয়ারাধীন থাকবে। (গ) কেন্দ্রের জন্য প্রয়োজনীয় বৈদেশিক মুদ্রার চাহিদা সমান হারে অথবা সর্বসম্মত কোন হারে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিই মিটাবে। (ঘ) অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলির মধ্যে দেশজ দ্রব্য চলাচলের ক্ষেত্রে শুল্ক বা করজাতীয় কোন রকম বাধা-নিষেধ থাকবে না। (ঙ) শাসনতন্ত্রে অঙ্গরাষ্ট্রগুলিকে বিদেশে নিজ নিজ বানিজ্যিক প্রতিনিধি প্রেরণ এবং স্ব-স্বার্থে বানিজ্যিক চুক্তি সম্পাদনের ক্ষমতা দিতে হবে।
প্রস্তাব – ৬ : আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠনের ক্ষমতা: আঞ্চলিক সংহতি ও শাসনতন্ত্র রক্ষার জন্য শাসনতন্ত্রে অঙ্গ-রাষ্ট্রগুলিকে স্বীয় কর্তৃত্বাধীনে আধা সামরিক বা আঞ্চলিক সেনাবাহিনী গঠন ও রাখার ক্ষমতা দিতে হবে।
যে অন্যায়, অবিচার ও বঞ্চনার শিকার বাঙালি জাতি হয়েছিলো সে সম্পর্কে কিছুটা আলোকপাত করতে চাই। অসহনীয় অবিচার ; জাতীয় শিল্প সম্পদের ৬০ ভাগের অধিক দুডজন পরিবারের হাতে, বীমা সম্পদের ৭০ ভাগ ও ব্যাঙ্কিং সম্পদের শতকরা ৮০ ভাগও ওই দুডজন পরিবারের হাতে।
ভয়াবহ বৈষম্য ; গত বাইশ বছরে সরকারী রাজস্ব খাতের মোট ব্যয়ের এক পঞ্চমাংশ বাংলাদেশে খরচ করা হয়েছে। সর্বক্ষেত্রে বাংলাদেশকে অর্থনৈতিক ভাবে চরম বঞ্চিত করা হয়েছে। উপরন্তু বাংলাদেশের অর্জিত ৫০০ কোটি টাকা পশ্চিম পাকিস্তান কুক্ষিগত করেছে।
চাকুরীতে বাঙালি নিয়োগে নিষেধাজ্ঞা ; সরকারী চাকুরীতে মাত্র ১৫ ভাগ ও দেশরক্ষা সার্ভিসে মাত্র ১০ ভাগ বাঙালী কর্মরত ছিলো।
অর্থনৈতিক বরাদ্দে ও নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের চড়া মূল্য; পশ্চিম পাকিস্তানের তুলনায় বাংলাদেশে দ্রব্যমূল্য ৫০-১০০ ভাগ বেশী। চাল, ডাল, আটা, ময়দা, সরিষার তেল সহ সব ভোগ্যপণ্য দ্বিগুনের বেশী মূল্য দিয়ে কিনতে হতো। পশ্চিম পাকিস্তান থেকে বাংলায় সোনা আনার ব্যাপারে কাস্টমসে বিধি নিষেধ আরোপ করা হয়েছিলো।
টাকা তৈরীর কল পশ্চিম পাকিস্তানে থাকতে পুরো অর্থনৈতিক নিয়ন্ত্রণ পশ্চিমাদের হাতে ছিলো।
কৃষক, শ্রমিকরা পশ্চিমাদের তুলনায় অর্ধেক পারিশ্রমিক পেতো।
এই বঞ্চনার ফর্দ লিখলে আরেকটি বই হয়ে যাবে। যাই হোক যে মহামানব বাঙালি জাতিকে মুক্ত স্বাধীন করে আত্মপরিচয় এনে দিয়েছে ১৯৭৫ সালের ১৫ ই অগাস্ট ব্যাংলাদেশ সেনাবাহিনীতে লুকিয়ে থাকা পাকিস্তানী প্রেতাত্মার দল তাঁকে সপরিবারে হত্যা করে। দৈবক্রমে বেঁচে যাওয়া তারই সুযোগ্য কন্যা দেশরত্ন শেখ হাসিনা সেই নৃশংস হত্যার বিচার সহ যুদ্ধাপরাধীদের বিচার সম্পন্ন করেছে। ঘাতকেরা জানতোনা ইতিহাস আজব্দি কাউকে ক্ষমা করেনি। ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করেনা।

রতন কুন্ডু